বাড়ছে বায়ু দূষণ: ভয়াবহ হতে পারে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ

শীত শুরুর আগের বাতাসে বেড়েছে ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা। অতিক্ষুদ্র এসব ধুলার মাত্রার ভিত্তিতে রাজধানীসহ দেশের প্রধান প্রধান শহরের বায়ু ইতোমধ্যে ছুঁয়েছে অস্বাস্থ্যকর থেকে অতিমাত্রার অস্বাস্থ্যকরের পর্যায়। বাতাসের এমন দূষণের কারণে প্রতিবছর এসময় দেখা দেয় শ্বাসকষ্টজনিত রোগ। তবে অতি সাবধানী না হলে এমন অস্বাস্থ্যকর বায়ু করোনা ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্ক্ষা বিশেষজ্ঞদের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়তো আর লকডাউন করা হবে না। তাই ‘স্বাভাবিক’ জীবনযাত্রায় অতিসতর্ক থাকাটাই সামাল দিতে পারে করোনার পরিস্থিতির ভয়াবহতা।

দেশের প্রধান প্রধান শহরের বায়ুতে ক্ষতিকর উপদানের উপস্থিতির মাত্রার ভিত্তিতে পরিবেশ অধিদফতরের ‘নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেস)’ প্রকল্পের অধীনে বাতাসের মানের সূচক (একিউআই) নির্ণয় করা হয়। কেসের নির্ণীত বায়ুর মানের তথ্য থেকে দেখা যায়, গত ৮ নভেম্বর রাজধানীর বাতাসে ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা ছিলো ১৯০ একিউআই (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স-বাতাসের মান সূচক) যা ছিল অতিমাত্রার অস্বাস্থ্যকর বায়ুর পর্যায়ে। একই দিন গাজীপুরে ছিল ১৫৯ একিউআই, রাজশাহীতে ১৭০ একিউআই, বরিশালে ১৫৬ একিউআই ও রংপুরে ১৫৭ একিউআই, যেগুলো ছিলো ক্ষতিকর বায়ুর পর্যায়ে।

দেশের অন্যান্য শহরের তুলনায় রাজধানী ঢাকা রয়েছে বায়ু দূষণের শীর্ষে। কেস’র বায়ুমানের তথ্য থেকে দেখা যায়, ৬ নভেম্বর বাতাসে ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা ২০৮ একিউআই (অতিমাত্রায় ক্ষতিকর), ৩ নভেম্বর ঢাকার বায়ু ছিল ‘সতর্কতামূলক’ পর্যায়ে যেখানে ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা ছিল ১৩০ একিউআই। ২ নভেম্বর বাতাস ছিল অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ের যার ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা ছিল ১৫৮ একিউআই।

কেস প্রকল্পে নির্ণীত তথ্য থেকে দেখা যায়, বছরের শুরুতে অর্থাৎ ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি রাজধানীর বাতাসে ক্ষতিকর উপদানের মাত্রা ছিল ৩০৪ একিউআই যা ‘চরম পর্যায়ের অস্বাস্থ্যকর’ বায়ু হিসেবে চিহ্নিত হয়। ২ জানুয়ারি তা ছিল ২৭৭ একিউআই, ৫ জানুয়ারি ছিল ৩০৯ একিউআই। আর মার্চের শেষ নাগাদ দুষনের মাত্রা কমে ২৯ মার্চ ছিল ১৯২ একিউআই, ৩০ মার্চ ছিল ১৭৩ একিউআই, ৩১ মার্চ ছিল ১৬৯ একিউআই।

বাতাসে ভাসমান বস্তুকণার মধ্যে যেগুলোর ব্যাস ১০ মাইক্রোমিটার সেসব বস্তুকণাকে পার্টিকুলার ম্যাটার (পিএম)-১০ এবং যেসব বস্তুকণার ব্যাস দুই দশমিক পাঁচ মাইক্রোমিটার সেগুলোকে পার্টিকুলার ম্যাটার (পিএম)-২.৫ এই দুই ভাগে ভাগ করে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হয়। আর এই দুই শ্রেণীর বস্তুকণা বাতাসের প্রতি ঘনমিটারে কত মাইক্রোগ্রাম আছে তা পরিমাপ করা হয় পার্টস পার মিলিয়ন বা পিপিএম এককে।

পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, বাতাসের একিউআই মাত্রা শূন্য থেকে ৫০ পিপিএম হলে তাকে ‘সবুজ বা স্বাস্থ্যকর’ বায়ু বলা হয়। একিউআই মাত্রা ৫১ থেকে ১০০ পিপিএম হলে তাকে ‘মধ্যম’ বায়ু বলা হয়, যা মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। মাত্রা ১০১ থেকে ১৫০ পিপিএম হলে সে বায়ুকে ‘সর্তকতামূলক’ বায়ু বলা হয়, যেটা মানুষের জন্য মৃদু ক্ষতিকর। একিউআই মাত্রা ১৫১ থেকে ২০০ পিপিএম হলে সে বায়ুকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ শ্রেণীতে ফেলা হয়। ২০১ থেকে ৩০০ পিপিএম একিউআই মাত্রার বাতাসকে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ শ্রেণীতে এবং ৩০১ থেকে ৫০০ পিপিএম মাত্রার বাতাসকে ‘চরম পর্যায়ের অস্বাস্থ্যকর’ বায়ু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের (আইকিউএয়ার) পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গেল এক সপ্তাহ রাজধানীর বাতাস ছিল জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পর্যায়ে। সংস্থাটির বার্ষিক পর্যাবেক্ষণ প্রতিবেদন অনুযায়ি, বিশ্বে বায়ু দূষণের দিক থেকে তালিকায় ২১ নম্বরে রয়েছে রাজধানী ঢাকা।

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের থোরাসিক সার্জারি বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষক অধ্যাপক ডা. আবদুর রাজ্জাক সময় সংবাদকে বলেন, নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশের শ্বাসকষ্টজনিত রোগ বেড়ে যায়। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে ধুলা-বালির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় প্রতিবছরই এ ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

তিনি বলেন, তবে অন্যান্য বারের তুলনায় এবার সময়টা আমাদের জন্য বেশি ভয়ঙ্কর হতে পারে। বিশ্বব্যাপী করোনা পরিস্থিতির দ্বিতীয় পর্যায়ের ঢেউ শুরু হয়েছে। আমাদের দেশের প্রথম করোনা আক্রান্তের ঘটনা ঘটে মার্চের শেষ দিকে। যে সময়টায় বায়ু দূষণজনিত রোগাক্রান্তের হার কমতে থাকে।

অধ্যাপক রাজ্জাক জানান, দেশে করোনা পরিস্থিতির এখন প্রথম ঢেউয়ের শেষের পর্যায়ে রয়েছে এমনটাই মনে হচ্ছে। হয়তো দ্বিতীয় পর্যায়ের ঢেউ শুরু হয়ে যাবে। যেহেতু নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়টা এমনিতে আমাদের মত ঘনবসতিপূর্ণ দেশের শহরগুলোর জন্য স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়ের একটা সময়, সেখানে করোনা পরিস্থিতি এটা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

করোনা সংক্রমণ সারা দেশে বিস্তৃতি পাওয়ায় দ্বিতীয় পর্যায়ের ঢেউ শুরু হলেও আর লকডাউন দেওয়া হবে না। সেক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাত্রা চলতে থাকবে, তাই এই সময়টাতে অতি সতর্কতা অবলম্বন না করলে করোনার শুরুর চাইতেও এবারের পরিস্থিতি আমাদের জন্য ভয়াবহ হবে।

বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসক বলেন, আমাদের (চিকিৎসক) পক্ষ থেকে, সরকারের পক্ষ থেকে বার বার মাস্ক পরার ব্যাপারে জোর দেওয়া হচ্ছে। আসলে এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় মাস্কের বিকল্প নেই। আর প্রয়োজন ছাড়া শিশু ও বৃদ্ধদের ঘরের বাইরে না নেওয়ায় ভাল। কারণ শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে আক্রান্তের হার তাদের মধ্যেই বেশি।

স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত সড়কগুলোতে পানি ছিটানো কার্যক্রম বাড়ানো, বাসস্থানের জানালা দরজা খোলা না রাখার প্রতিও জোর দেন তিনি।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাকালিন পরিস্থিতি মোকাবেলায় শীতে আবাসিক এলাকাগুলো যথা সম্ভব নির্মাণ কাজ চালাতে যথাযথ ধূলা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নির্মাণকাজ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলোতে নিয়মিত পানি ছিটিয়ে ধুলা প্রতিরোধ করতে হবে।

somoynews

About namiradistro

Check Also

Ari Wibowo Mengaku Tak Pernah Sholat Saat Muslim

Pengakuan Ari Wibowo tentang perjalanan pindah keyakinan dari muslim ke kristen menyedot perhatian publik. Kini, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

six − 5 =